রাতে কানের শব্দ বেশি লাগে, কারণ চারপাশের আওয়াজ কমে যায়, তুলনা করার মতো কিছু থাকে না, আর মন নিজের ভেতরের দিকে ফেরে। বেশিরভাগ মানুষের কাজে আসে তিনটি জিনিস: কানের শব্দকে পুরো না ঢেকে একটানা নিচু একটি আওয়াজ, রোজ একই রুটিন, আর মাঝরাতে ফোন না ঘাঁটা। অ্যাপ শুধু শব্দটা দেয়; ভালো ঘুমের অভ্যাস বা ডাক্তারের পরামর্শের জায়গা নেয় না।
রাতে কানের শব্দ কেন বেশি লাগে
দিনে রাস্তার গাড়ি, কথাবার্তা, টিভি আর ফ্যানের আওয়াজ কানের শব্দকে অনেকটা ঢেকে রাখে। রাতে এসব থেমে গেলে ভেতরের শোঁ শোঁ বা ভোঁ ভোঁ শব্দই ঘরের একমাত্র আওয়াজ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক লেখায় সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের একজন ইএনটি ডাক্তারও শোবার ঘরে টিকটিক করা দেয়ালঘড়ি বা টিনিটাস মাস্কিং অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
দ্বিতীয় কারণ মনোযোগ। শুয়ে পড়ার পর মাথায় আর কোনো কাজ থাকে না, তাই মন বারবার শব্দটার দিকে ফিরে যায়। যত খেয়াল করবেন, শব্দটা তত স্পষ্ট শোনাবে।
তৃতীয়টি একটা চক্র: ঘুম না হলে দুশ্চিন্তা বাড়ে, দুশ্চিন্তা বাড়লে কানের শব্দ আরও বিরক্তিকর লাগে, তাতে ঘুম আরও কমে। এই চক্র ভাঙতে নীরবতার বদলে একটা নরম, একটানা আওয়াজ অনেকের কাজে আসে। মার্কিন সংস্থা NIDCD-ও কানের শব্দ কম টের পাওয়ার একটি উপায় হিসেবে পটভূমির শব্দের কথা বলে।
টিনিটাস নিয়ে ঘুমানোর জন্য কোন শব্দ ভালো
| শব্দ | কেমন শোনায় | কাদের বেশি পছন্দ |
|---|---|---|
| হোয়াইট নয়েজ (ফ্রি) | সব ফ্রিকোয়েন্সিতে সমান, একটানা শোঁ শোঁ | উঁচু সুরের কানের শব্দ, প্রথম কয়েক রাত |
| পিংক নয়েজ | হোয়াইট নয়েজের চেয়ে নরম, কম ধারালো | যাঁদের হোয়াইট নয়েজ কর্কশ লাগে |
| ব্রাউন নয়েজ | গভীর, দূরের মেঘের গর্জন বা জলপ্রপাতের মতো | উঁচু সুরের টিনিটাস, যাঁদের ঘুম পাতলা |
| বৃষ্টির শব্দ | প্রাকৃতিক, এলোমেলো ছন্দ | যাঁদের কৃত্রিম নয়েজ ভালো লাগে না |
| সমুদ্রের ঢেউ | ধীর ওঠানামা | ঘুমিয়ে পড়ার সময়, শ্বাসের তালে তাল মেলাতে |
| ফ্যানের শব্দ | পরিচিত ঘরোয়া গুঞ্জন | যাঁরা এমনিতেই ফ্যান চালিয়ে ঘুমান |
হোয়াইট নয়েজ আর ব্যাকগ্রাউন্ড প্লে ফ্রি; বাকি শব্দ আর স্লিপ টাইমার Premium-এ, ৩ দিনের ফ্রি ট্রায়ালসহ (দাম ও Premium)।
ভলিউম কতটা রাখবেন
নিয়ম একটাই: কানের শব্দের ঠিক একটু নিচে, পুরোপুরি ঢেকে না দিয়ে। এই জায়গাটাকে অনেকে বলেন মিক্সিং পয়েন্ট, যেখানে বাইরের আওয়াজ আর কানের শব্দ মিশে যায়। কেন? শব্দটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে (একে বলে habituation) মস্তিষ্কের কানের শব্দটা একটু হলেও শুনতে পাওয়া দরকার। খুব জোরে পুরোপুরি ঢেকে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয় না, তাতে বিরক্তিও বাড়তে পারে। মাঝারি ভলিউমে শুরু করুন, প্রথম সপ্তাহে ধীরে ধীরে কমান।
হেডফোন বাধ্যতামূলক নয়। বেশিরভাগ মানুষের জন্য বিছানার পাশে রাখা ফোনই যথেষ্ট। পাশের মানুষের নীরবতা দরকার হলে ঘুমের হেডব্যান্ড বা বালিশের নিচে রাখার ছোট স্পিকার কাজে আসে।
স্লিপ টাইমার (Premium)
টাইমারে নিজের মতো একটা সময় বেছে নিন, যেমন আধা ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টা। বন্ধ হওয়ার আগে শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসে, তাই হঠাৎ থেমে যাওয়ার ধাক্কায় ঘুম ভাঙে না। চাইলে সারা রাতও চালিয়ে রাখতে পারেন: নেটিভ লুপ, দুই রিপিটের মাঝে কোনো ফাঁক নেই, স্ক্রিন লক থাকলেও চলে। হেডফোন খুলে গেলে বা ব্লুটুথ কেটে গেলে শব্দ থেমে যায়, হঠাৎ লাউডস্পিকারে জোরে বেজে ওঠে না।
৭ রাতের সহজ রুটিন
- প্রতি রাতে একই শব্দ বাজান, যাতে মস্তিষ্ক সেটাকে ঘুমের সংকেত হিসেবে চিনে নেয়।
- ভলিউম রাখুন কানের শব্দের একটু নিচে।
- টাইমার দিন, অথবা সারা রাত চালিয়ে রাখুন।
- ফোন উল্টো করে রাখুন, স্ক্রিন লক করে দিন।
- রাত ৩টায় ঘুম ভেঙে গেলে নীরবতায় শুয়ে না থেকে শব্দটা আবার চালু করুন।
প্রথম কয়েক রাত কয়েক দিনের মধ্যেই একটু সহজ লাগতে পারে; শব্দের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লাগে। সবার অভিজ্ঞতা এক রকম হয় না। শুরু করতে অ্যাপটি ফ্রি ডাউনলোড করুন।
সাধারণ প্রশ্ন
রাতে কানের শব্দ বেশি লাগে কেন?
রাতে চারপাশের আওয়াজ কমে যায়, তাই কানের ভেতরের শব্দের সঙ্গে তুলনা করার মতো কিছু থাকে না। তার ওপর শুয়ে থাকলে মন বারবার শব্দটার দিকেই যায়। শব্দটা সাধারণত বাড়ে না, শুধু বেশি কানে লাগে।
হোয়াইট নয়েজ কি টিনিটাস নিয়ে ঘুমাতে সাহায্য করে?
অনেকের ক্ষেত্রে করে: একটানা মৃদু আওয়াজ কানের শব্দকে কম টের পাওয়ার মতো করে তোলে। প্রমাণ এখনো সীমিত, আর ফল একেকজনের একেক রকম। Tinnitus Relief App-এ হোয়াইট নয়েজ ফ্রি।
সারা রাত শব্দ চালিয়ে রাখা কি নিরাপদ?
মাঝারি ভলিউমে হ্যাঁ। ভলিউম কানের শব্দের চেয়ে নিচে রাখুন। কানে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে বন্ধ করে ডাক্তার দেখান।
টিনিটাসে পিংক নয়েজ ভালো, না হোয়াইট নয়েজ?
কোনোটাই সবার জন্য সেরা নয়। হোয়াইট নয়েজ বেশি উজ্জ্বল ও ধারালো, পিংক নয়েজ নরম। দুটোই কয়েক রাত করে চালিয়ে দেখুন, যেটা সহজ লাগে সেটাই রাখুন।
টিনিটাস নিয়ে ঘুমাতে কি হেডফোন লাগবে?
না। বেশিরভাগ মানুষের জন্য বিছানার পাশে রাখা ফোনের স্পিকারই যথেষ্ট। পাশের মানুষের অসুবিধা হলে ঘুমের হেডব্যান্ড বা বালিশের স্পিকার ব্যবহার করতে পারেন।
স্ক্রিন লক থাকলেও কি অ্যাপ বাজতে থাকে?
হ্যাঁ। শুধু ফোন কল এলে শব্দ থেমে যায়, আর কল শেষ হলে নিজে থেকে আবার শুরু হয়।
Tinnitus Relief App কোনো মেডিক্যাল ডিভাইস নয় এবং ডাক্তারের পরামর্শের বিকল্প নয়। কানে শব্দ হঠাৎ শুরু হলে, শুধু এক কানে হলে, হৃৎস্পন্দনের তালে তালে হলে, অথবা সঙ্গে কম শোনা, মাথা ঘোরা বা কানে ব্যথা থাকলে দেরি না করে একজন ইএনটি (নাক-কান-গলা) বিশেষজ্ঞ বা অডিওলজিস্ট দেখান।
তথ্যসূত্র
- প্রথম আলো, সমস্যার নাম টিনিটাস (২০২২): https://www.prothomalo.com/lifestyle/health/30uoxq5apq
- দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, কানে শোঁ শোঁ শব্দ নিয়ে প্রতিবেদন (২০২৪): https://bangla.thedailystar.net/life-living/wellness/news-582866
- NIDCD (National Institutes of Health), Tinnitus: https://www.nidcd.nih.gov/health/tinnitus
- Sereda M. et al., Cochrane Review 2018, Sound therapy for tinnitus: https://doi.org/10.1002/14651858.CD013094.pub2

